গবেষণা থেকে ক্লাসরুম: প্রফেসর মাসুদ সরকারের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা
প্রফেসর মাসুদ সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক। তিনি সাপ্তাহিক অভিভাবক পত্রিকার সম্পাদক তাহাজীব হাসানের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শেয়ার করেছেন তাঁর গবেষণাজীবন, বিদেশের অভিজ্ঞতা, ছাত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে।
গবেষণা জীবন: সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমেরিকা ভ্রমণ
তাহাজীব হাসান: ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার গবেষণার সম্পর্কে বলুন।
মাসুদ সরকার:
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি গবেষণা করেছি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে—বিশেষ করে “U.S. Foreign Policy towards India”। গবেষণার সময় আমার মূল ফোকাস ছিল ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
এই গবেষণার কাজ আমি করেছি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আমার দুজন সুপারভাইজার ছিলেন—প্রধান সুপারভাইজার একজন ব্রিটিশ, যিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পররাষ্ট্রনীতির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। আরেকজন ছিলেন আমেরিকান। তাঁদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি।
আমার গবেষণার অংশ হিসেবে আমি আমেরিকায় গিয়েছি এবং ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে পনেরো জন নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ ও গবেষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। বিষয়টি আমার কাছে ছিল একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর।
ডেভিড ক্যামেরন প্রসঙ্গ
তাহাজীব হাসান: আপনি বলছিলেন যে ডেভিড ক্যামেরনের ঘনিষ্ঠ কারও কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। সরাসরি উনার সঙ্গে কোনো অভিজ্ঞতা আছে?
মাসুদ সরকার:
না, ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি। তবে আমার সুপারভাইজার যেহেতু তাঁর উপদেষ্টা ছিলেন, তাই ওনার কাছ থেকে অনেক গল্প শুনেছি। ক্যামেরনকে নিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপন।
তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েও ভোরে নিজে হাঁটতে বের হতেন, পথে সুপারশপ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেন, ঘরে এসে পরিবারের সঙ্গে নাশতা করতেন। অতিথি এলে নিজেই দরজা খুলে দিতেন এবং বিদায় দেয়ার সময়ও দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। এমন সরল ও মানবিক গুণ আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা অভিজ্ঞতা
তাহাজীব হাসান: আমেরিকায় যেসব নীতিনির্ধারকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কী নিয়ে আলোচনা করেছেন?
মাসুদ সরকার:
মূলত আমার গবেষণা বিষয়ক প্রশ্নগুলোই করেছি। বিশেষ করে—যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক, ৯/১১-এর প্রভাব, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ইত্যাদি। রাজনীতিবিদদের তুলনায় গবেষক ও পলিসি মেকারদের সঙ্গেই বেশি আলাপ করেছি।
গবেষণার প্রধান ফাইন্ডিংস
তাহাজীব হাসান: আপনার গবেষণা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কী কী ফলাফল পেলেন?
মাসুদ সরকার:
আমার গবেষণার মূল ফলাফল হলো—৯/১১ ঘটনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক হঠাৎ ঘনিষ্ঠ হয়নি, বরং এই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, বিশেষ করে বিল ক্লিনটনের সময় থেকে।
চীনের উত্থান এবং ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করেছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে। ৯/১১ কেবল সেই প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করেছে।
আরেকটি বিষয় ছিল নরেন্দ্র মোদীর প্রসঙ্গ। গুজরাট দাঙ্গার কারণে তিনি একসময় আমেরিকায় প্রবেশে নিষিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু সবাই জানতেন, তিনি একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক বজায় রাখবে? প্রায় সবাই একমত হয়েছিলেন—যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তখন তাঁকে নিষিদ্ধ রাখা সম্ভব হবে না। বাস্তবেও তাই হয়েছে।
আমেরিকা বনাম যুক্তরাজ্য: সামাজিক তুলনা
প্রশ্ন: আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মাসুদ সরকার:
আমি প্রথমে ইংল্যান্ডে দুই বছর ছিলাম, তারপর আমেরিকায় যাই। অনেকে আমেরিকাকে স্বর্গরাজ্য বলে ভাবেন, কিন্তু যুক্তরাজ্যে থাকার পর আমার মনে হয়েছে ব্রিটিশ সমাজ আরও বেশি শৃঙ্খলাপূর্ণ, অপরাধ কম, মানুষ বেশি ভদ্র।
আমেরিকায় অনেক কিছু ভালো থাকলেও বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ তুলনামূলক বেশি। তাই আমার কাছে যুক্তরাজ্যই বসবাসের জন্য সেরা মনে হয়েছে।
সাসেক্সের জীবন
প্রশ্ন: সাসেক্সে থাকার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মাসুদ সরকার:
চমৎকার। যুক্তরাজ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি আছেন, বিশেষ করে সিলেটি কমিউনিটি। তাই প্রথম থেকেই একটা পরিচিত পরিবেশ পেয়েছি।
ব্রিটিশ মানুষদের সহানুভূতি ও সাহায্য করার মানসিকতা আমাকে অভিভূত করেছে। রাস্তা হারালে তাঁরা নিজের ফোন বের করে পথ দেখিয়ে দিতেন, অনেক সময় আমার সঙ্গে হেঁটে গিয়েছেন।
অবশ্য জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল ছিল। পরিবহন খরচ অনেক বেশি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্থিক সহায়তা ও লাইব্রেরিতে পার্টটাইম কাজ করে টিকে গিয়েছি।
দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত
প্রশ্ন: এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন দেশে ফিরে এলেন?
মাসুদ সরকার:
আমার সুপারভাইজারসহ অনেকেই চেয়েছিলেন আমি সেখানেই থেকে যাই। পরিবারও সমর্থন করেছিল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম—যতটুকু শিখেছি, তা আমার দেশের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। তাই ফিরে এসেছি।
দেশে এসে হতাশা ও আশার গল্প
প্রশ্ন: দেশে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কী অভিজ্ঞতা হলো?
মাসুদ সরকার:
প্রথমে আমি হতাশ হয়েছিলাম। অনেক ছাত্রছাত্রী শুধু বিসিএস পরীক্ষা নিয়েই ব্যস্ত। গবেষণা বা জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা কম ছিল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শ্রদ্ধাশীল আচরণ কমে গিয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরে পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী গবেষণা করছে, দেশের জন্য কাজ করতে চায়। এই পরিবর্তন আমাকে আশান্বিত করেছে।
শিক্ষকতার দায়বদ্ধতা
প্রশ্ন: কিছু শিক্ষক সময়মতো ক্লাস নেন না, খাতা মূল্যায়নে দেরি করেন—এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
মাসুদ সরকার:
এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন শিক্ষক দায়িত্বশীল না হলে পুরো ব্যাচের ছাত্রছাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় চাকরির আবেদনও ঝুলে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। জরিমানা নয়, কার্যকর জবাবদিহি ও মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে হবে। কারণ শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা।
গণতন্ত্র প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: ৫ আগস্টের পর গণতন্ত্রের যাত্রা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাসুদ সরকার:
১৭ বছর পর আমরা গণতন্ত্রের দিকে ফিরে যাচ্ছি—এটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে শুধু ভোটের দিনের গণতন্ত্র যথেষ্ট নয়।
আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, বৈষম্য দূর করতে হবে। অন্যথায় গণতন্ত্র টেকসই হবে না। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সমাজের প্রতিটি নাগরিকের।
তাহাজীব হাসান : আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে খোলামেলা আলাপ করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
মাসুদ সরকার: ধন্যবাদ। আপনারা সময় নিয়ে আমার কথা শুনেছেন, এটাই আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।
(সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের সুবিধার্থে কিছুটা সংক্ষেপ ও সম্পাদিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)