• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি: প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অভিঘাত ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি: প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অভিঘাত ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য

ড. খান জহিরুল ইসলাম

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সুগভীর ও কাঠামোগত সমস্যাগুলোর একটি হলো—চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত রেন্ট-সিকিং নেটওয়ার্ক। বন্দর-অদক্ষতা, কৃত্রিম বিলম্ব, অবৈধ আর্থিক সুবিধা এবং নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—এসবকে যাঁরা ব্যক্তিগত আয়ের ধারাবাহিক উৎসে পরিণত করেছেন, তারা আজ দেশের আধুনিক, কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের বন্দর-সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্নীতিগ্রস্থ এই গোষ্ঠী খুব ভালো করেই জানে যে একবার যদি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং বৈশ্বিকভাবে পরীক্ষিত অপারেশনাল টার্মিনাল মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাদের বহু বছরের অবৈধ আর্থিক প্রবাহ একেবারে শেষ হয়ে যাবে। তাই লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (LCT) চুক্তির বিরোধিতা মূলত কোনো অর্থনৈতিক যুক্তির ভিত্তিতে নয়; বরং নিজেদের প্রতিষ্ঠিত অবৈধ আর্থিক আধিপত্য হারানোর গভীর আশঙ্কা থেকেই তাদের উচ্চকণ্ঠ প্রতিরোধ।

যে গোষ্ঠী আজ ‘বন্দর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে’ অথবা ‘দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকিতে’—এই ধরনের নাটকীয় ও ভিত্তিহীন বক্তব্য ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে, তারাই দীর্ঘদিন ধরে বন্দরকে প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার মধ্যে আটকে রেখে এটি থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা ভোগ করেছে। বাস্তবে এটি অর্থনীতির একটি বৃহৎ স্বচ্ছ সংস্কার বনাম অস্বচ্ছ স্বার্থকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের প্রতিরোধ।

ফলে বিষয়টি সামান্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়; বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা, সাপ্লাই-চেইনের কার্যকারিতা এবং বিলিয়ন ডলারের অপচয় রোধের প্রশ্নে একটি মৌলিক ও নীতিগত অবস্থান। উন্নয়নশীল দেশের যেকোনো বন্দরেই রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের প্রথম প্রতিরোধ আসে সবচেয়ে বেশি অবৈধ সুবিধাভোগী অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর কাছ থেকে—এবং বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

 

 

. চট্টগ্রাম বন্দর অব্যবস্থাপনার নির্মম বাস্তবতা:

বাংলাদেশের বন্দরে মূল চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এবং অস্বাভাবিক দীর্ঘ ওয়েটিং টাইম। আন্তর্জাতিক সব পরিমাপকেই দেখা যায় যে বাংলাদেশ বন্দর ব্যাবস্থাপনায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান দেয়া হলো:

  • বিশ্বের ৪০৫টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান র‍্যাঙ্কিং ৩৩৪তম।
  • অপরদিকে ভিয়েতনাম বৈশ্বিক অপারেটর ও প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবস্থাপনা এনে কাই মেপ (Cai Mep) বন্দরকে বিশ্ব র‍্যাঙ্কে ৭ম স্থানে উন্নীত করেছে। ইন্দোনেশিয়া Tanjung Priok টপ ৫০-এর মধ্যে, শ্রীলঙ্কা Colombo Port টপ ৩০-এর মধ্যে.
  • চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ধারণক্ষমতা প্রায় ৫৩,৫১৮ TEU, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইয়ার্ডে ~৪৮,৪৯৪ TEU পর্যন্ত কনটেইনার জমে (জট) গেছে, যা ধারণক্ষমতার প্রায় ৯০ %-এর মতো।
  • চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাধ্যমে গড় পণ্য খালাস সময় লাগে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা । অপরদিকে ভিয়েতনাম Cai Mep-এর কাস্টম ক্লিয়ারেন্স টাইম ২.৩ দিন. ভারতীয় সমুদ্রবন্দরগুলোর গড় ক্লিয়ারেন্স টাইম ৮৫.৪২ ঘণ্টা (প্রায় ৩.৫৭দিন)।
  • বন্দর-ডিপোতে জাহাজ ও কনটেইনার জট এমন পর্যায়ে যে শিপিং এজেন্ট ও আমদানিকারক অতিরিক্ত খরচ বহন করছেন; একটি জাহাজ একদিন অপেক্ষমান থাকলে ১৫,০০০ USD পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হয়।
  • বার্ষিক ঘুষ/চাঁদাবাজি: বন্দরের ব্যবহারকারীরা (importers/exporters) বছরে প্রায় Tk 7.8 বিলিয়ন (≈ US$130–132 million) ঘুষ দিচ্ছে।
  • ২০২৩–২৪ হিসাব বছরের অডিটে Tk 1,314 কোটি (≈ Tk 13.14 বিলিয়ন) মূল্যের বড় অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে—যেখানে টেন্ডার ও চুক্তি পরিচালনায় অনিয়ম আলোকপাত করা হয়েছে।
  • ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের Logistics Performance Index (LPI) অনুসারে, ২০২৩ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের র‌্যাংক ছিল ৮৮তম (মোট ১৩৯টি দেশের মধ্যে), যেখানে এটি ২০১৮-এ ছিল ১০০তম। “Tracking and Tracing” বিভাগে বাংলাদেশের স্থান ২০২৩ সালে ১০৫তম হয় (২০১৮-এ ছিল ৭৯তম)
  • আমদানিকরণের প্রক্রিয়াগত দেরি ও “ট্রেড অ্যাক্রস বর্ডার” অকার্যকারিতা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, FICCI-এর একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে বাংলাদেশ “ট্রেড অ্যাক্রস বর্ডার” বিভাগে র‌্যাংক ছিল ১৭৬তম, যেখানে ভারত ছিল ৬৮তম।
  • চট্টগ্রাম পোর্ট “নেগেটিভ ইন্ডেক্স স্কোর” পায় (প্রশাসনিক পন্থায় –১০৯.২৫ এবং পরিসংখ্যানগত পন্থায় –৫৪.৯৪৯), যা নির্দেশ করে এটি বিশ্বগড় থেকে অনেক বেশি সময় নেয় জাহাজ সার্ভিস করার জন্য।
  • Container Port Performance Index (CPPI): চট্টগ্রাম (চিটাগং) পোর্ট ২০২১ সালে মোট ৩৭০টি বন্দরের মধ্যে ৩৪১তম স্থানে ছিল.
  • দৈনিক ক্ষতি: বার্ষিক প্রায় USD 1.1 বিলিয়ন, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় USD 3 মিলিয়ন। ক্ষতির মধ্যে আছে ডিমারেজ/ডিলে , অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, দীর্ঘ ট্রানজিট সময়, কম রফতানি, হারানো অর্ডার, উচ্চ ইনপুট খরচ এবং FDI হ্রাস।
  • সম্ভাব্য সঞ্চয় (World Bank – Bay Terminal Projection): অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা সংস্কারের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় USD 1 মিলিয়ন সঞ্চয় করা সম্ভব।

. কেন বন্দরের এই অবস্থা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর:

  • উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়: দেশের ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত সময় এবং অর্থ ব্যয় করে, যা তাদের পণ্যগুলোর গ্লোবাল প্রতিযোগীতাকে ধ্বংস করছে।
  • রফতানিতে বিলম্ব: গার্মেন্টস, কৃষিপণ্য ও হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প সময়মত রফতানি করতে পারছে না . ফলে আন্তর্জাতিক চাহিদা হারাচ্ছে।
  • বিনিয়োগ হ্রাস: যদি পোর্ট কার্যকারিতা উন্নত না হয়, প্রাইভেট ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে কারণ শিপারদের জন্য ঝুঁকি বেশি।
  • অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত: আমদানিতে বিলম্ব মানে উৎপাদন চেইন ধীরগতি, যা অভ্যন্তরীণ শিল্পগুলোর বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্থ করছে।
  • প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পিছিয়ে পড়া: পাকিস্তান (Port Qasim) বা ভারতের পোর্ট দ্রুত উন্নতি করছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ ও রফতানি বাজারে সুবিধা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে , যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল করছে।

 . লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (LCT) চুক্তি কেন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (LCT) চুক্তি হয়েছে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এর সঙ্গে. এটি বিশ্বখ্যাত এপি মোলার-মেয়ার্স্ক গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তারা বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বন্দরের ১০টি অপারেট করে । ৩৩টি দেশে সর্বমোট ৬০টির বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে এই মুহূর্তে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ও চীনে অপারেট করছে তারা।

BIDA-র তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (LCT) প্রকল্প বাংলাদেশের বন্দর সংস্কারে এক রূপান্তরমূলক মাইলফলক. নিম্নে  এই চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ  তথ্য দেয়া হলো:

  • মোট বিনিয়োগ প্রায় Tk ৬,৭০০ কোটি, যা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক অপারেটর APM Terminals-এর দ্বারা বিনিয়োগকৃত. বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মূলধন ব্যয় নেই।
  • সাইনিং মানি Tk ২৫০ কোটি পরিশোধিত।
  • টার্মিনালের প্রাথমিক সক্ষমতা প্রায় ৮০০,০০০ TEU/বছর, যা কার্যত চট্টগ্রাম বন্দরের মোট হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪৪% বৃদ্ধি করবে।
  • চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর, যা আন্তর্জাতিক PPP মানদণ্ডে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
  • এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার কোনো ঋণ নেয়নি, কোনো আর্থিক ঝুঁকি নেয়নি। বরং সম্পূর্ণ বেসরকারি মূলধনে একটি বিশ্বমানের আধুনিক টার্মিনাল পাচ্ছে, যা দেশের বাণিজ্য ব্যয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
  • নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে ৫০০-৭০০ সরাসরি স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পরিবহন, লজিস্টিকস ও বৃহত্তর সাপ্লাই চেইনে হাজার হাজার পরোক্ষ স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ।
  • এপিএম টার্মিনালসের নিজস্ব ট্রেনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্থানীয় প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাবেন।
  • ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেশন সিস্টেম, LEAN পদ্ধতি ও FLOW Framework-এর মাধ্যমে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর হবে।
  • বাংলাদেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব গ্রীন পোর্ট হবে এটি।
  • প্রতি ইউনিটে পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে। আমদানি - রপ্তানি দ্রুততর হবে।
  • এখনকার তুলনায় দ্বিগুণ বড় কনটেইনার জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারবে।
  • বিশ্বের দূরবর্তী দেশগুলোর সাথে সঙ্গে সরাসরি জাহাজ সংযোগের সুযোগ উন্মুক্ত হবে।

 ৫. পোর্ট ম্যানেজমেন্টে বিদেশী কোম্পানির আন্তর্জাতিক উদাহরণ:

বিশ্বের যেসব দেশ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে পেশাদার গ্লোবাল অপারেটরকে দায়িত্ব দিয়েছে তাদের বন্দর দক্ষতা, রপ্তানি ও FDI নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। আর যেখানে বন্দরের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ জারি আছে সেখানেই অদক্ষতা স্থায়ী হয়েছে। নিম্নে কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:

★ ভিয়েতনাম: Cai Mep–Thi Vai Port Complex Foreign/global operators: APM Terminals, CMA CGM, DP World গ্লোবাল অপারেটররা দায়িত্ব নেয়ার পর এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল বন্দর। FDI প্রবাহ বেড়েছে. ট্রেড-কস্ট উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর মূল কারণ হলো রাজনৈতিক অনিয়ম ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক পেশাদারি অপারেশন শুরু।

★ মালয়েশিয়া: Tanjung Pelepas (PTP). Foreign/Global Operator: APM Terminals (৩০% শেয়ার এবং অপারেশনাল নেতৃত্ব). Tanjung Pelepas বন্দর উচ্চ দক্ষতা, দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিঙ্গাপুরের PSA-এর দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। আজ এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দ্রুত, আধুনিক এবং উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব।

★ UAE: Khalifa Port Foreign/global operator: Abu Dhabi Ports + CMA CGM + Cosco Shipping Ports. এই বন্দর আজ প্রায় ১০০% ডিজিটাল। Automated cranes, zero congestion standard-এর অধীনে। মূল কারণ হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপহীন, corporate-grade global অপারেশনাল মডেল।

★ ভারত: Mundra Port-Foreign/global operator: উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন অংশীদার—MSC, Maersk, CMA CGM—যারা নিয়মিত direct call পরিচালনার মাধ্যমে এখানে বৈশ্বিক মানের অপারেশন নিশ্চিত করছে। বন্দরটির উচ্চ দক্ষতা ও পেশাদার বেসরকারি ব্যবস্থাপনা ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে বৈপ্লবিকভাবে ত্বরান্বিত করেছে। Mundra আজ ভারতের সর্ববৃহৎ এবং দ্রুততম বর্ধনশীল সমুদ্রবন্দর. এটির সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো দক্ষ, আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারি অপারেশন মডেল।

৬. লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (LCT) চুক্তি বিরোধীদের যুক্তি এবং তার জবাব:

যুক্তি #: “বন্দর বিক্রি হয়ে গেছেবাবিদেশিদের নিয়ন্ত্রনে চলে গেছে: মোটেই সত্যি নয়. মালিকানা ১০০% বাংলাদেশের। APM শুধু অপারেটিংয়ের দায়িত্ব পেয়েছে, সেটিও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিরাপত্তা, কাস্টমস, নৌবাহিনী—সবই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। লালদিয়া চরে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এপিএম একটি নতুন টার্মিনাল নকশা ও নির্মাণ করবে। বিশ্বমানের টার্মিনাল লালদিয়ায় তৈরি হলে মালিক হবে বাংলাদেশ। নির্মাণকাল তিন বছর। এরপর এপিএম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। সময় শেষ হলে তারা সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাবে। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল যথারীতি বলবৎ থাকবে। টার্মিনালে ব্যবহৃত সব প্রযুক্তি ও অপারেশনাল প্রক্রিয়ায় সরকার অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ডেটা লোকালাইজেশন, সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা, ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রিনিং এবং অ্যাক্সেস কন্ট্রোল মেকানিজম নিশ্চিত করা হবে। এই পুরো ব্যবস্থাপনাই সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে।

যুক্তি # : চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর খুব বেশি”: সত্যি নয়. বিশ্বের সব আধুনিক PPP বন্দর ২০–৫০ বছরের কনসেশন মেনে চলে। ভারত, মালয়েশিয়া, UAE, ভিয়েতনাম, এই সব দেশে ৩০–৩৫ বছরের চুক্তি করেছে। যেমন, ভারত ২০১৮ সালে - মুম্বাই পোর্ট ৬০ বছর, চীন ২০০৩ সালে - সাংহাই পোর্ট ৫০ বছর, ভিয়েতনাম ২০১০ সালে - কাই মেপ পোর্ট ৫০ বছরের চুক্তি করেছে। বড় বিনিয়োগের পে-ব্যাক সাইকেল কমপক্ষে ২০–২৫ বছর। সুতরাং, বাংলাদেশের এই ৩০ বছরের চুক্তি খুবই স্বাভাবিক।

যুক্তি # : “আমরা শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটছি - Hambantota”:  মোটেই সত্যি নয়. শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর চীনা ঋণে নির্মিত। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কান সরকার ৯৯ বছরের জন্য চীনা কোম্পানির কাছে কন্ট্রোলিং ইকুইটি স্টেক দিয়ে দিতে বাধ্য হয়। হাম্বানটোটা থেকে আমাদের শিক্ষা হল যে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর কাঠামো ও দুর্বল রিস্ক শেয়ারিং মডেল দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ ওই পথে হাঁটেনি। লালদিয়া টার্মিনালের মালিক রাষ্ট্র এবং এটির জন্য বাংলাদেশ কোন ঋণ নেইনি. এটি সম্পূর্ণরূপে এপিএম এর বিনিয়োগ। চুক্তিতে ট্রাফিক স্টাডি, রিস্ক শেয়ারিং, কারেন্সি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্টেপ-ইন রাইটের মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক কাঠামো টেকসই ও স্বচ্ছ থাকে।

যুক্তি# : স্বচ্ছতা নেই: এই অভিযোগ সত্যি নয়. কারণ PPP-তে পুরো চুক্তি প্রকাশ না করা বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাভাবিক। শুধু বাংলাদেশ না, কোন দেশের সরকারই পিপিপি চুক্তির মূল দলিল জনসম্মুখে প্রকাশ করবে না আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে। সরকারি ক্রয়নীতি ও পিপিপি গাইডলাইন অনুযায়ী পূর্ণ প্রকাশ নিরাপদ নয় কারণ এটি ভবিষ্যৎ দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। BIDA ইতিমধ্যেই মূল পরিসংখ্যান, রেভিনিউ মেকানিজম, অবকাঠামো নকশা ও নিরাপত্তা কাঠামো প্রকাশ করেছে।

যুক্তি#: “বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সমস্যা না মিটিয়ে নতুন টার্মিনাল কেন?”: বর্তমান টার্মিনালগুলো ডিজিটাইজেশন, ইয়ার্ড রিডিজাইন, গেট অপ্টিমাইজেশন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সংস্কার চলছে। লালদিয়ায় বিশ্বমানের নতুন টার্মিনাল যোগ হলে অপারেশনাল প্রতিযোগিতা বাড়বে। বন্দর অবকাঠামোর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই। এক প্রকল্প একসাথে বটলনেক রিমুভাল ও নতুন সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করবে।

যুক্তি#: “অপারেটর বাছাই স্বচ্ছ/আইনানুগ হয়নি”: অভিযোগ সত্যি নয়. PPP নীতিমালার G-to-G পদ্ধতির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান, প্রাক-যোগ্যতা যাচাই, টেকনিক্যাল ও ফিনান্সিয়াল মূল্যায়ন, ডিউ ডিলিজেন্স করা হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার, আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট নিযুক্ত করা হয়েছে। আন্ত মন্ত্রণালয় টেন্ডার কমিটি গঠন এবং প্রতিটি ধাপের অডিটযোগ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে।

৭. চুক্তি সম্পাদনে বাংলাদেশ সরকারের কি প্রক্রিয়াগত কোনো ভুল ছিলো?:

এই ধরনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদনের আগে সরকার চাইলে রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আরও বিস্তারিত আলোচনা করতে পারত। তবে বাস্তবতা হলো, যেহেতু বহু বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বন্দরে হাজার হাজার কোটি টাকার ঘুষ–চাঁদাবাজির শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তাই সরকার খুব সম্ভবত অনুমান করেছিল যে তাদের সঙ্গে আলোচনায় গেলে দেশের অর্থনীতির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। অতএব, আপাতদৃষ্টিতে এটি সরকারের ভুল মনে হলেও, দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় সরকার সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।

৮. এখন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয় কী?:

এখন সরকারের উচিত রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ, এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে যতটা সম্ভব খোলামেলা, তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা করা। আলোচনার মাধ্যমে সরকারের আরও সুস্পষ্টভাবে, তথ্য প্রমাণসহ, পুরো বিষয়টি জনগণের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। তাহলে জনমনে যে আশংকা তৈরী হয়েছে সেটা অনেকটাই দূর হবে. একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর তাদের মতামত পরিষ্কারভাবে, তথ্য-উপাত্তসহ, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও যুক্তি দিয়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। এরপর, সরকার ও বিশেষজ্ঞগণ যদি মূল্যায়নের মাধ্যমে মনে করেন যে চুক্তির কোনো অংশ দেশের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, তবে সরকার প্রয়োজন হলে সেই নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে চুক্তিকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুনঃআলোচনা (renegotiation) করার চেষ্টা করতে পারে।

 ৯. উপসংহার:

চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের অদক্ষতা, দুর্নীতি, অস্বচ্ছ রেন্ট-সিকিং নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বিলম্বের যে গভীর কাঠামোগত সংকট বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে, তা ভাঙতে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) চুক্তি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিশ্বের দ্রুত অগ্রসরমান দেশগুলো যেমন ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পেশাদার বৈশ্বিক অপারেটর এনে বন্দর-দক্ষতায় বিপ্লব ঘটিয়েছে; বাংলাদেশও সেই অপরিহার্য পথে হাঁটছে। এই চুক্তি দেশের মালিকানার কোনো ক্ষতি করছে না; বরং সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, নিরাপদ এবং দ্বিগুণ সক্ষমতার বিশ্বমানের একটি টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে - যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াবে, পরিবহন-শৃঙ্খল খরচ কমাবে, শিল্প উৎপাদন ত্বরান্বিত করবে এবং প্রতিদিনের ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের অপচয় রোধ করবে। যারা দীর্ঘ কয়েক দশকের অবৈধ আয় হারানোর ভয়ে ভয়-তত্ত্ব ছড়াচ্ছে, তারা জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও সরবরাহ-শৃঙ্খলার আধুনিকায়নের জন্য লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) চুক্তি শুধু প্রয়োজনীয় নয় - এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অনিবার্য ও বাতিল-অযোগ্য একটি চুক্তি।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা

তথ্য সূত্র: BIDA, World Bank, NBR, TIB, Economic Relations Division: Ministry of Finance, Federation of Indian Chambers of Commerce and Industry, Journal of Commerce, The Business Standard, bdnews24.com, Daily Jugantor.

 

 

২২ নভেম্বর ২০২৫, ১০:০৮এএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।