হাজার মতিউরের দেশে কাঠগড়ায় এক "মতিউর"
মতিউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের কাঠগড়ায় ১২ আগস্ট দেখা গেল এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য—একজন সাবেক দুর্নীতিগ্রস্ত শীর্ষ কর কর্মকর্তার কান্না, হাতজোড় করা আকুতি এবং হারিয়ে যাওয়া একটি পরিবারের করুণ বাস্তবতা।
যার মূল কারণ এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের লাগামহীন দুর্নীতি।
যিনি একসময় দেশের রাজস্ব প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন, আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। তাঁর কণ্ঠে অসহায়ত্ব, চোখে জল, মুখে দাড়ি আর হাতে একটি চিঠি—যা তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর পাঠিয়েছেন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে।
গত বছরের কোরবানি ঈদে তাঁর ছেলে মুশফিকুর রহমানের ১৫ লাখ টাকায় ছাগল কেনা ভাইরাল হওয়ার পরই মতিউর রহমানের বিলাসবহুল জীবনের পর্দা ফাঁস হয়। সেই ছাগলকাণ্ড থেকেই গড়াতে থাকে একের পর এক দুর্নীতির চক্র—যা গড়ায় পাঁচটি মামলায়, শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে। আজ সেই ব্যক্তিই বলছেন, “মাননীয় আদালত, আমার পিতা মারা গেছেন, আমার মা স্ট্রোক করেছেন, সংসার ভেঙে গেছে—আমি ধ্বংস হয়ে গেছি।”
আদালত তখন শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আপনার বিরুদ্ধে সিরিজ অব করাপশনের অভিযোগ রয়েছে। সত্য উদঘাটনে সময় লাগবে। দুদকের জালে এখন হাজার মতিউর।”
এ যেন এক দুঃস্বপ্নের প্রতিচ্ছবি—কোনো এক সময়কার প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সবার সামনে ভেঙে পড়ছেন।
এতদিন যাঁরা ছিলেন untouchable, আজ তাঁরাই জবাবদিহিতার মুখোমুখি। মতিউর রহমান, তাঁর প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ, দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলী এবং তাঁদের সন্তানদের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে-বাইরে বিপুল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। বিলাসবহুল গাড়ি, ঘড়ি, রিসোর্ট, শুটিং স্পট, জমি—সবকিছুই এখন অনুসন্ধানের তালিকায়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ আরও গভীর বার্তা দেয়: “দুদক শুধু এক মতিউরের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। এমন হাজার মতিউর দেশে ছড়িয়ে আছে—তাদের খুঁজে বের করাই এখন বড় দায়িত্ব।”
এ যেন দেশের নৈতিক পতনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ব্যক্তির গল্প—যে গল্পে আছে ক্ষমতা, বিলাসিতা, পরিবার ভাঙার যন্ত্রণা আর শেষ পর্যন্ত কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কাঁদা এক সাবেক কর্মকর্তার করুণ আকুতি।
কিন্তু রাষ্ট্র এখন আর অন্ধ নয়। আইনের চোখ এখন খোলা। এবং সে চোখে ধরা পড়ছে হাজারো 'মতিউর'। এক একটি মামলা শুধু এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, পুরো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সওয়াল।
এবার সময় এসেছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন হাজারো মতিউর তৈরি হতে থাকবে।